রোদ-জলে পোড়া জীবনের আখ্যান
ঘামে ভেজা সবুজ পাতা আর চা শ্রমিকদের অন্তহীন লড়াই
তপ্ত দুপুরের সূর্যটা যখন আকাশ থেকে যেন আগুন ঢেলে দিচ্ছে, পিচঢালা পথ থেকে শুরু করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের দেয়ালগুলো যখন উত্তাপে হাঁসফাঁস করছে, ঠিক তখনই এক মুঠো ভাতের খোঁজে, বেঁচে থাকার তাগিদে প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন কিছু মানুষ। তারা আমাদের চা শ্রমিক।
হবিগঞ্জের মাধবপুর আর চুনারুঘাটের সবুজ চা বাগানগুলোর দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু এই সতেজ সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার শ্রমিকের তপ্ত নিশ্বাস, বুকফাটা আর্তনাদ আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এক নীরব দাসত্বের ইতিহাস। জ্যৈষ্ঠের এই তীব্র, নির্মম দাবদাহেও তাদের হাত দুটি থামার উপায় নেই। কারণ, তাদের থমকে যাওয়া মানেই চুলোয় হাঁড়ি না চড়া, তাদের থমকে যাওয়া মানেই সন্তানদের মুখে অন্ন না জোটা।
জগদীশপুর চা বাগানের অমরি সাঁওতালের দিনটা শুরু হয় আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো আয়েশ করে নয়। ভোর হতেই যখন লাইন চৌকিদারের কর্কশ হাঁকডাক কানে আসে, তখনই বুকটা ধক করে ওঠে। এক নিমেষে ভেঙে যায় ঘুমের ঘোর, শুরু হয় যান্ত্রিক এক জীবনের প্রস্তুতি। একদিকে সকালের রান্না, অন্যদিকে সন্তানদের মুখে দুটো গুঁজে দিয়ে নিজের দুপুরের খাবারটা গামছায় বেঁধে নেওয়া—এই তো তাদের প্রাত্যহিকী। তারপর চশমা, টুপি আর পিঠে ঝুড়ি বেঁধে নেমে পড়া অন্তহীন এক সংগ্রামে।
অমরি সাঁওতালের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল এক চরম সত্যের হাহাকার: "রোদ, বৃষ্টি, ঝড়-তুফান যাই হোক না কেন, কাজে যেতেই হয়। কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে?"
এই ‘কীভাবে’ প্রশ্নের কোনো উত্তর আজও মেলেনি। বৈকুণ্ঠপুর, নোয়াপাড়া, সুরমা আর তেলিয়াপাড়ার আকাশে-বাতাসে কেবল এই দীর্ঘশ্বাসটুকুই ঘুরে বেড়ায়।
সবুজ পাতার নিচে চাপা পড়া কান্না
সুরমা চা বাগানের লাল মোহন আর আমু বাগানের ভারতী মুন্ডাদের শরীর আজ ক্লান্ত, অবসন্ন। গত ১০ দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে শরীর যখন আর চলে না, মাথাটা যখন ঝিমঝিম করে ঘোরে, তখনও তাদের দু’হাতে সচল রাখতে হয় কুঁড়ি তোলার চঞ্চলতা। রোদে চামড়া পুড়ে তামাটে হয়ে যায়, পায়ের নিচে মাটি যেন খই ফোটে, তবুও মাথা গোঁজার বা একটু জিরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো ছায়া নেই তাদের ভাগ্যে।
ভারতী মুন্ডা বলছিলেন: "প্রখর রোদের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। প্রতিদিনই আমাদের লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়।"
এটি কেবল কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি মূলত এক একটি প্রাণের প্রতিদিনকার যুদ্ধ। চন্ডীছড়া চা বাগানের সুমন তন্তুবায় মনে করিয়ে দিলেন এক নির্মম বাস্তবতা—এই আগুনে গরমে সবচেয়ে বেশি পুড়ছেন নারী শ্রমিকরা। মাতৃত্বের টান, পিঠে বাঁধা সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের টান—সব মিলিয়ে এই নারীদের জীবন যেন এক জীবন্ত অগ্নিপরীক্ষা।
যাদের ঘামে ভেজা পাতায় চুমুক দিয়ে এ দেশের কোটি মানুষ সকালের সতেজতা খুঁজে পায়, যাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে সচল থাকে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত—তাদের নিজেদের জীবনটাই আজ চরম অবহেলিত। চা শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তারের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে সেই বঞ্চনার চিত্র। তীব্র এই গরমে একটু মাথা গোঁজার মতো একটা আশ্রয়কেন্দ্র নেই বাগানের ভেতরে, নেই এক ফোঁটা নিরাপদ সুপেয় পানির নিশ্চয়তা। অসুস্থ হলে নেই পর্যাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসা।
আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও, চা শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারটুকুর জন্য মালিকপক্ষ কিংবা সরকারের দয়ার দিকে চেয়ে থাকতে হয়, এর চেয়ে বড় সামাজিক পরিহাস আর কী হতে পারে?
তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন স্থবির হতে পারে, কিন্তু চা বাগানের এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম স্থবির হয় না। তারা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে, তারা ভাগ্যের পরিহাসের সাথে লড়াই করে, তারা লড়াই করে টিকে থাকার আদিমতম প্রয়োজনে।
সবুজ চা পাতার যে সুবাস আমাদের তৃপ্ত করে, তা আসলে এই অবহেলিত মানুষগুলোর রক্ত আর ঘামের সুবাস। কবে শেষ হবে এই আদিম দাসত্বের রূপরেখা? কবে এই সংগ্রামী মানুষগুলো একটু মানবিক জীবনের স্বাদ পাবে? প্রকৃতির এই তীব্র দাবদাহের চেয়েও শ্রমিকদের বুকের ভেতরের অবহেলার আগুন কি কম পোড়াচ্ছে আমাদের বিবেককে?
ফয়সল চৌধুরী /ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: