জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম আলোচনায়
জাতিসংঘের বর্তমান নবম মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদের সফল কার্যকাল আগামী ৩১ ডিসেম্বর (২০২৬) চূড়ান্তভাবে শেষ হতে যাচ্ছে; আর ঠিক এই কারণেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিপাড়ায় জাতিসংঘের পরবর্তী দশম মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই এক ব্যাপক তোলপাড় ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য বিশ্ব নেতৃত্বের তালিকায় বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সাবেক সফল রাষ্ট্রনেতা, ঝানু কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের নাম বিশ্ব গণমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে; তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চমকপ্রদ ও গৌরবোজ্জ্বল খবর হলো— জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ পদের সম্ভাব্য হাইপ্রোফাইল প্রার্থীদের তালিকায় নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও বাংলাদেশের সাবেক সফল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনানুষ্ঠানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। কূটনৈতিক মহলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের অত্যন্ত জটিল ও আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়াটি সাধারণত চলতি মেয়াদের শেষ বছরে এসে চূড়ান্ত গতি পায়; সেই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চলমান ৮০তম অধিবেশনের সাইডলাইন থেকেই মূলত পরবর্তী বিশ্ব নেতা নির্ধারণ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মাঝে প্রাথমিক ও অত্যন্ত গোপনীয় কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আকাশচুম্বী ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ঐতিহাসিক নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তি, দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার বৈপ্লবিক দর্শন এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের আন্তর্জাতিক কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই বৈশ্বিক শীর্ষ পদের রেসে একটি অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম করে তুলেছে; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর অতি পরিচিতি ও বিশ্ব নেতাদের সাথে গভীর সখ্যের বিবেচনায় তিনি যে নিঃসন্দেহে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও অনন্য ব্যক্তিত্ব— এমন আলোচনা আন্তর্জাতিক ফোরামে মোটেও নতুন নয়।
তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম জোরালো আলোচনায় থাকলেও তাঁর এই স্বপ্নিল যাত্রায় জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের অলিখিত ‘আঞ্চলিক ভারসাম্যের’ (Regional Rotation) একটি বড় জটিল প্রশ্ন ও মারপ্যাঁচ এখন সবচেয়ে সামনে চলে আসছে; অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি মুন এশিয়া মহাদেশীয় অঞ্চল থেকে জাতিসংঘের মহাসচিব পদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস; ফলে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের অলিখিত আঞ্চলিক রোটেশন ও ভৌগোলিক নীতিমালার আলোকে এশিয়া অঞ্চলকে বাদ দিয়ে এবার মূলত আফ্রিকা অথবা লাতিন আমেরিকা মহাদেশীয় অঞ্চল থেকে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই শতভাগ বেশি বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে মনে করছেন। জাতিসংঘের এই মেগা মহাসচিব নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মাঝে এক বিশাল ও নেপথ্য বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে; তবে তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে এই পদের চূড়ান্ত লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) পি-ফাইভ (P5) বা মহাশক্তিশালী পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের প্রত্যক্ষ লিখিত সমর্থন এবং তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ না থাকাটা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। ফলে ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তীব্র রাজনৈতিক সমীকরণ, পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের যৌথ ঐকমত্যই শেষ পর্যন্ত এই পদের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক
এ রহমান
মন্তব্য করুন: