কোরবানির ঈদ এলেও জমেনি সুনামগঞ্জের কামারশালা
কয়লার আগুনের রক্তিম আভায় পুড়ছে কালো লোহা। সেই তপ্ত লোহার ওপর অবিরত পড়ছে ভারী হাতুড়ির চোট। টুং-টাং শব্দে মুখরিত চারপাশ। প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলে সুনামগঞ্জের কামারশালাগুলোর চিরচেনা চিত্র এটিই। কিন্তু এবার সেই শব্দের মাঝে লুকিয়ে আছে এক নীরব হাহাকার। উৎসবের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও, সুনামগঞ্জের কামার শিল্পীদের চোখে-মুখে এখন কেবলই দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। যে সময়ে দম ফেলার ফুরসত থাকার কথা ছিল না, সেই সময়ে ক্রেতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা।
সুনামগঞ্জ শহরের পশ্চিম বাজার রোডসহ জেলার বিভিন্ন কামারশালা ঘুরে দেখা যায়, দিনরাত পরিশ্রম করে দা, ছুরি, চাপাতি, বঁটি, কুড়াল তৈরি করে সাজিয়ে রেখেছেন কারিগরেরা। কিন্তু দোকানগুলোতে ক্রেতাদের সেই চেনা ভিড় নেই। আগের তুলনায় অর্ডারের সংখ্যা কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে।
অধিকাংশ কামার শিল্পীই পৈতৃক সূত্রে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার স্মৃতি আর অস্তিত্বের প্রশ্নে শত কষ্টের মাঝেও এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তারা। তবে বর্তমানের কঠিন বাস্তবতায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন এই আদি পেশা।
পশ্চিম বাজারের প্রবীণ কামার শিল্পী জগদীশ দাস ক্ষোভ ও আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে বলেন, "সারা বছর আমরা এই কোরবানির ঈদের দিকে চেয়ে থাকি। এবারও অনেক কষ্ট করে দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি তৈরি করে রেখেছি, কিন্তু বিক্রি নেই। লোহা আর কয়লার দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় আমাদের তৈরি মালের দাম বাড়ছে না। আগে পশ্চিম বাজারে অনেক দোকান ছিল, এখন কমতে কমতে ৫-৭টায় ঠেকেছে। ব্যবসা না থাকায় অনেকেই পেশা বদলে ফেলছেন।" তবে শত কষ্টের মাঝেও আশা ছাড়েননি জগদীশ; তার প্রত্যাশা, ঈদের আর দুই-তিন দিন আগে হয়তো কিছুটা হলেও বেচাকেনা জমবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কামার পেশায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়াও। সুনামগঞ্জ শহরের মুক্তারপাড়ার মতো কিছু এলাকায় এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে নয়, মেশিনের সাহায্যে শান দেওয়া হচ্ছে দা-ছুরিতে। কিন্তু এই আধুনিকতাও যেন গ্রামীণ কামার শিল্পীদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারছে না। কেবল জেলা শহর নয়, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামীণ হাট-বাজারের কামারশালাগুলোর চিত্রও একই রকম মলিন।
এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক মানুষদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে হয়তো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এই প্রাচীন কামার শিল্প। হাতুড়ির প্রতিটি আঘাতে লোহা যেভাবে আকৃতি পায়, ঠিক তেমনি সরকারি একটু সহযোগিতা পেলে এই শিল্পীদের জীবনটাও আবার নতুন করে গুছিয়ে উঠতে পারত।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: