বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ

চার দিনে ২২ জনের মৃত্যু

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ

প্রথম ডেস্ক

০৯/০৭/২০২৬ ২০:১৮:৫৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলার শতাধিক গ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবক তাসনীম বলেন, "বাড়ির চারপাশে পানি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকেছে। সন্তানদের পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তারা মানসিকভাবেও চাপে রয়েছে।"

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বুধবার বিকেলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে প্লাবিত এলাকার পরিধি আরও বাড়তে পারে।

জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। এ কারণে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

টানা বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ধসে গত চার দিনে কক্সবাজারে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে মারা গেছেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা ডবলতলী এলাকায় পাহাড়ধসে দুই শিশু নিহত হয়। নিহতরা হলো ওবাইদুল ইসলাম (১৩) ও রুমী আক্তার (১৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা উভয় নদীর বিপদসীমার চেয়ে বেশি। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া যায়নি। শুধু চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় মোট ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি জানান।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

সজল আহমেদ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad