জবাবিদিহিতার আওতায় আসছে সিলেটের দুই ওলির মাজার

আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ

জবাবিদিহিতার আওতায় আসছে সিলেটের দুই ওলির মাজার

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

১২/০৬/২০২৬ ১৭:৫১:৪৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের প্রধান দুই আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.)-এর মাজারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখন থেকে ভক্ত ও পর্যটকদের দেওয়া সব ধরনের দান ও মানতের অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশুসহ মূল্যবান সামগ্রীর যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (১২ জুন) হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম গণমাধ্যমকর্মীদের এই তথ্য জানান। পরিদর্শনকালে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ উপস্থিত ছিলেন।


মাজার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জেলা প্রশাসক জানান, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শুধু সিলেট অঞ্চলের নয়, বরং সারা বাংলাদেশের একটি নেয়ামত ও গর্বের স্থান। এখানে মাজার, মসজিদ ও মাদরাসা—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই তিনটির সমন্বয়ে একটি নান্দনিক ইসলামী কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর অংশ হিসেবে সরকার ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজালাল মাজারে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছে এবং মাজারের আধুনিকায়নে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, এখানকার মাদরাসাটি যেন উন্নত মানের হয়ে 'দ্বিতীয় দেওবন্দের' মতো ভূমিকা রাখে, যেন শিক্ষার্থীরা আমল ও এলেমে বিশ্বজুড়ে আলো ছড়াতে পারে। একই সাথে মসজিদটি স্থাপত্যকীর্তি ও নান্দনিক রূপ পাক, যাতে আগন্তুকরা এসে শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারেন। মাজার প্রাঙ্গণকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও অত্যাধুনিক করার মাধ্যমে মূলত হযরত শাহজালাল (র.) যে উদ্দেশ্যে ইসলামের আলো প্রচার ও প্রসারের জন্য এখানে এসেছিলেন, সেই আদর্শকে ফুটিয়ে তোলা হবে।


এর আগে গত বুধবার (১০ জুন) সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিলেট সিটি করপোরেশন, ওয়াকফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় দরগাহ দুটির বর্তমান আয়-ব্যয়, দান-অনুদান, প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাজার ভক্তদের মতে, প্রতিদিন এসব মাজারে লাখ লাখ টাকার দান এলেও সেই অর্থ কীভাবে পরিচালিত বা কোথায় ব্যয় হয়, তার কোনো বিস্তারিত তথ্য কখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। গেল বুধবারের সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন কমিটির পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য আর্থিক রেকর্ড উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলে তারা তা উপস্থাপন করতে পারেনি।


ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ২০০৩ সালে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনার পর দরগাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় মাজার কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, দানের অর্থের একটি অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের পেছনে এবং অবশিষ্ট অংশ মাজারের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়। তবে সেই ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত বা অডিট করা হিসাব কখনো দেখা যায়নি। এই প্রসঙ্গে বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, মাজারগুলোর বর্তমান আয়-ব্যয়ের মধ্যে কোনো স্বচ্ছতা নেই এবং তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাবও নেই। এই অচলাবস্থা দূর করতে আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে মাজারের সব হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই সময়ের মধ্যে আয়-ব্যয়ের সঠিক চিত্র, দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।


অবশ্য এই প্রশাসনিক উদ্যোগের বিষয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, তাদের কাছে হিসাবপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো গুছিয়ে প্রশাসনের সামনে উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির দরকার। একই সাথে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


এদিকে মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের এই কঠোর ও ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সিলেটের ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, দরগাহ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সম্পদ, তাই এর হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও নিয়মিত অডিট করা জরুরি। 


সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাবও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে ভক্তদের আস্থা আরও বাড়বে এবং দানের অর্থ ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক কাজে সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।


ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad