অধস্তন কর্মকর্তাকে চড় মারার ঘটনায় সিলেটের নির্বাচন কর্মকর্তাকে শাস্তি

১ বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত

অধস্তন কর্মকর্তাকে চড় মারার ঘটনায় সিলেটের নির্বাচন কর্মকর্তাকে শাস্তি

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৬/০৬/২০২৬ ২৩:৫০:৫৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

শেরপুরে কর্মরত থাকাকালীন নিজের অধীনস্থ এক সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে অকারণ বাকবিতণ্ডার জেরে প্রকাশ্যে চপেটাঘাত (চড়) করার গুরুতর ও ন্যাক্কারজনক অপরাধে সিলেটের বর্তমান নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে ‘তিরস্কার’ এবং একই সাথে আগামী এক বছরের জন্য তাঁর ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত’ রাখার কঠোর শাস্তিমূলক দণ্ড প্রদান করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দণ্ডপ্রাপ্ত মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বর্তমানে সিলেট সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আজ শনিবার (৬ জুন) নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদের যৌথ অনুস্বাক্ষরে জারি করা এই সংবেদনশীল প্রজ্ঞাপনটি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সরকারের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের (সিএএফও) কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।

ইসি’র অফিসিয়াল প্রজ্ঞাপনের বিবরণ ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এর আগে যখন শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন গত ২০ জানুয়ারি অফিসের প্রিন্টারের টোনার ক্রয়ের বকেয়া সরকারি বিল পরিশোধের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে কেন্দ্র করে কার্যালয়ের ভেতরেই এক অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে জাতীয় গণমাধ্যমেও বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঘটনার দিন বকেয়া বিলের জেরে নকলা কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম দে’র সঙ্গে মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়; একপর্যায়ে উগ্র মেজাজ হারিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জুনিয়র কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম দে-কে অকথ্য ও আপত্তিকর ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং চরম ক্রোধান্বিত হয়ে সবার সামনে তাঁকে সজোরে চড় মারেন। এছাড়া তাদের দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের দাপ্তরিক মতবিরোধ, ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত, অধস্তনদের সাথে অসম আচরণ, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং চরম অকর্মকর্তাসুলভ আচরণের চাঞ্চল্যকর সত্যতাও নির্বাচন কমিশনের বিভাগীয় তদন্তে নিখুঁতভাবে উঠে আসে।

তদন্ত প্রতিবেদনে ইসির তদন্ত কর্মকর্তা স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার এমন উগ্র ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড দাপ্তরিক চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে; এই গুরুতর অপরাধের জেরে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তৎকালীন নকলা ও বর্তমান সিলেট কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগনামার লিখিত জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ইসি’র কাছে ব্যক্তিগত শুনানির জন্য আবেদন করলে গত ২১ মে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে তাকে সশরীরে হাজির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের শেষ সুযোগ দেওয়া হয়; শুনানিতে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও তাঁর দাখিলকৃত লিখিত জবাব, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন, ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং শুনানিতে দেওয়া অসংলগ্ন বক্তব্য দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে নির্বাচন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে আনীত শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার অভিযোগের সত্যতা শতভাগ খুঁজে পায়।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর শাস্তি সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে নিজের কার্যালয়ের সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে অমানবিকভাবে আঘাত করেছেন এবং অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চেইন অব কমান্ড ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন; তাঁর এই অমার্জনীয় আচরণ স্পষ্টতই সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এবং তা একটি দণ্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অবস্থায় দেশে বিদ্যমান সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৪(২)(ক) অনুযায়ী তাকে সরকারি নথিতে ‘তিরস্কার’ এবং একই বিধিমালার ৪(২)(খ) ধারা মোতাবেক আগামী এক বছরের জন্য তাঁর ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি সম্পূর্ণ স্থগিত’ করার লঘু দণ্ড প্রদান করেছে নির্বাচন কমিশন; এই শাস্তিকালীন সময়ে তিনি সরকারের কোনো আর্থিক বর্ধিত সুবিধা পাবেন না বলেও প্রজ্ঞাপনে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।


এ রহমান

মন্তব্য করুন: